#ছোটোগল্প
"পাগল ভৈরব"
#পুলক_সাঁপুই।
সামসুখ ভাই। সকলেই এই নামে চেনে। পাঁচ বছর এই গ্রামে এসেছে। এই গ্রামে এক জমিদার বাড়ি আছে বিশাল পাঁচিল দিয়ে ঘেরা। সামসুখ বাড়িটি কিনেছেন। তিনি আগে বিদেশে থাকতেন।
সামসুখ ভাই আসার পর থেকে এই গ্রামে অনেক উন্নতি হয়েছে। তিনি সরকারকে প্রয়োজনে চিঠি লেখেন গ্রামের উন্নতির জন্য। স্কুল, স্বাস্থ্যকেন্দ্র, রাস্তা ঘাট, জল, আলো ইত্যাদির সুব্যবস্থা হয়েছে ওনার চেষ্টায়।
গ্রামের প্রতিটা মানুষ সামসুখ ভাইকে খুব মান্যি করে চলে।
সামসুখ ভাইয়ের আসল নাম কেউ জানে না।
ক্রিশ্চানরা বলে Sam Wood. মুসলিমরা বলে সামসুদ্দিন। হিন্দুরা বলে শ্যামসুন্দর।
প্রতিটা ধর্মের মানুষ তাদের নিজের ধর্মের মানুষ ভাবে।
মানবধর্ম হারিয়ে বিধর্মীরা ধর্মের পরিচয় চায়। নামে কি আসে যায়? কর্মই আসল পরিচয়।
এক সন্ধ্যায় চায়ের দোকানে বসে চা খাচ্ছি।
এ সময়ে সামসুখ ভাই আমাকে দেখে কাছে ডাকলেন।
তিনি পাঁচ বছরে পাঁচবার সাদা চুনকাম করেছেন পাঁচিলে। কিন্তু পরিচ্ছন্ন দেওয়াল বেশীদিন রাখতে পারছেন না। কেউ না কেউ কিছু না কিছু লিখে বা সাঁটিয়ে দিয়ে যায় নানা বিজ্ঞাপন ইত্যাদি। তিনি পাঁচিলে বড়ো বড়ো করে লিখছিলেন "বিজ্ঞাপন লাগাবেন না"। কে কার কথা শোনে?
যে কে সেই।
শত্রু বলে কেউই নাই সামসুখ ভাইয়ের।
তবুও, এমন কেন মানুষে করে?
কিছু জায়গায় দেওয়ালে অলিখিত মূত্রখানাও বানিয়ে দিয়েছে এই সকল রাস্তা চলাচলের পথের মানুষে।
সামসুখ ভাই এই পরিস্থিতি থেকে মুক্তির উপায় কি হতে পারে আমার কাছ থেকে বুদ্ধি চাইলে।
আমি পড়ি মুশকিলে। আমার সাথে বুদ্ধির সম্পর্ক? ভাবি নাই আগে কখনও। নিজেই নিজেকে বিশ্বাস করতে পারছিলাম না।
তবে মাথায় একটা বুদ্ধি খেলে গেল। পাগলা ভৈরব এর কাছে এর উপায় অবশ্যই আছে।
সামসুখ ভাই ভৈরবের পরিচয় জিজ্ঞেস করলেন।
আমি বলি, - সে সমাজের কাছে পাগল। আমার কাছে মহামানব, মুশকিল আসান। সে ভবঘুরে।
প্রয়োজনে তার কাছেই যেতে হবে।
অনেক খুঁজে খুঁজে শেষে; - তিন মাইল জঙ্গলের ভিতর, তাল দিঘির পাশে, বড় তেঁতুল গাছ, ঠিক তার পাশে চালতা গাছের নিচে চ্যাটাই পেতে পাগল ভৈরব পেঁচা ও বিড়ালের সাথে খেলা করে।
এখানে আমার গা ছমছম করে। সামসুখ ভাই ভ্যাবাচ্যাকা খায় এইসব দেখে।
এই জঙ্গলের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, অনুভূতির কথা ভৈরব কে শোনাতে যাই। ভৈরব বলে, ভণিতা রাখ, সোজাসুজি আসল কথায় আয়।
সামসুখ ভাই ও ভৈরবের অনেক কথা হয়।
সামসুখ ভাইয়ের কাছ থেকে কাগজ কলম চেয়ে অনেক কিছু খসখস করে লিখে দিল। স্বর্ণোজ্জ্বলের মতো সুন্দর তার হাতের লেখা ও আঁকিবুকি।
স্থাপত্যরীতি সংক্রান্ত (Architectural) আঁকা ও বিভিন্ন ধরণের উদ্ভিদ ও ফুলের নাম ও তাদের বৈজ্ঞানিক নাম অনর্গল লিখে দিলো।
আরো লিখলো ও এঁকে দিলো - শিশু কিশোরদের বিভিন্ন ধরণের খেলা ও কসরত করার মজার মজার কলাকৌশলের উপকরণ।
সাইকেল চালানোর রাস্তা।
মানুষের হেঁটে চলার ফুটপাত।
সমস্তকিছুই হবে ঐ পাঁচিলের পাসে পাশে।
শুধুমাত্র তা নয়, কতো খরচ হতে পারে, তার ও আনুমানিক মূল্য (Estimate) লিখে দিলো।
আমি জলের তরঙ্গ দেখি বাতাসের সাথে তাল-পুকুরে। পদ্ম ফুল ও শালুক ফুলের উপরে ঘাস ফড়িঙের খেলা দেখি।
বেশ কিছুদিন যায়। জমিদার বাড়ির পাঁচিলের ভাঙ্গা গড়া চলে। একদিন সামসুখ ভাই এর সাথে দেখা। আমি বলি খবর কি? সে বলে, - পাগল ভৈরবের কাছে প্রায়ই যেতে হয় নানান সলাপরামর্শ করতে। মানুষটার দর্শনশক্তি আছে বটে, তার পরিকল্পনা অনুযায়ী এগিয়ে চলেছি।
সে চৌরাস্তার ফুটপাতে কখনো রাজার হাটের পীর তলায় অথবা বাউল গ্রামের বট তলায় কিংবা ফিরিঙ্গী সাহেবের লঞ্চ ঘাটে কোথায় কখন থাকে। তাকে খুঁজে পাওয়া বড়ই কষ্টের।
তাই পাঁচিল তৈরীর কাজ ও ধীর গতিতে এগোয়।
প্রায় বছর গড়ায়। আমি আবার এই গ্রামে। প্রথমেই ছুটি জমিদার বাড়ির পাঁচিল দেখতে। ঘুরে ঘুরে দেখি চারিধার। পাঁচিল দেখে অবাক হই। মানুষের জন্য টয়লেট ও পানীয় জলের সুবন্দোবস্ত বানিয়েছেন। ধবধবে সাদা পাথরের। স্ত্রী ও পুরুষের জন্য। কোথাও কোথাও বসার জায়গা। বাচ্চাদের বিভিন্ন ধরণের খেলার ব্যবস্থা আছে। পাঁচিলের সাথে নানা ধরনের গাছের ও ফুলের বাহার।
নানান ধরণের বর্ণময় ছবি আঁকা মহাপুরুষের ও উক্তি লেখা সুন্দর ক্যালিগ্রাফিতে।
এসব দেখে অনেক কিছু জানতে পারি। যেমন, বাসক পাতা কে জাস্টিসিয়া (Justicia) নিমকে অ্যাজাডিরিক্টা ইন্ডিকা (Azadirachta Indica), কুলেখাড়া শাককে হাইগ্রফিলা ওরিকুলাটা (Hygrophila auriculata), কালমেঘ ও চিরতা একই গাছ। ইমনই অশ্বগন্ধা, আমলকি ইত্যাদি ইত্যাদি ছবি আঁকা ও বড় বড় করে লেখা আছে যা আয়ুর্বেদিক ও হোমিওপ্যাথিক ঔষধের ব্যবহার ও গুনাগুন।
পাঁচিলের সাথে সাথে নতুন নতুন গাছ রোপণ করা হয়েছে।
আশেপাশের গ্রামের মানুষ, স্কুল কলেজের ছেলেমেয়েরা এমন সুন্দর পাঁচিল দেখতে আসে। এই পাঁচিল এখন মানুষের কাছে দর্শনীয় স্থান।
পাঁচিলের এক দিকে দেখি পাগল ভৈরবের প্রতিকৃতি আঁকা। এক দিকে বিড়াল এক দিকে প্যাঁচা, হাতে তার মাকাল ফল লাল টকটকে। এই গাছের উপকারিতা সমন্ধে অনেক কিছু লেখা আছে পাশে।
___________________

No comments:
Post a Comment