"শুক্রবারি"
নানা ধরনের মানুষ আসে পুরনো জিনিসপত্র কম পয়সায় পাওয়ার আশায়।
বিখ্যাত ভাস্কর শর্বরী রায়চৌধুরী পুরানো গানের গ্রামোফোন রেকর্ড সংগ্রহ করেছিলেন এই বাজার থেকে, যখন তিনি MS University তে পড়তেন।
অনেক বিখ্যাত মানুষ এখানে আসতেন ও আসেন প্রাচীন জিনিসপত্রের খোঁজে।
এমনই আহমেদাবাদে রবিবারি বা Sunday Market বসে।
এখন গল্পে আসি।
অনেক বছর আগে তখন আমি MS University তে ২য় বর্ষের ছাত্র। প্রায় প্রতি সপ্তাহে এই শুক্রবারি বাজারে ঘুরতে যাই।
এক শীতের সকালে সোয়েটার মাফলার ঢেকে সাইকেল নিয়ে বাজার ঘুরে ঘুরে দেখছি। ভাঙা যন্ত্রপাতি, পুরনো খেলনা, ভাঙা চেয়ার টেবিল আলনা,বই, রেকর্ড, ক্যাসেট, আরো কতো কি!
হটাৎ এক জায়গায় চোখ আটকে যায়। এক বিক্রেতা দুটি পুরনো ময়লা পেইন্টিং, কিছু পুরানো বই ও কয়েকটা পুরানো তালাচাবি নিয়ে বসে আছে।
তার ঠিক পাশেই বইয়ের দোকান। আমি একটা বেঞ্চে বসে চায়ের অর্ডার দিয়ে পেইন্টিং দেখছি। অনেক পুরানো অয়েল পেইন্টিং!
আমি বিক্রেতাকে জিজ্ঞাসা করলাম, সে ঐ দুটি পেইন্টিং কোথায় থেকে পেয়েছে? সে আমাকে জানালো, এক পুরানো ঘর ভাঙা হচ্ছিল, সেখান থেকে ওই সমস্তগুলি সংগ্রহ করেছে।
এমন সময় এক ভদ্রলোক এসে ঐ পেইন্টিংয়ের দাম জিজ্ঞাসা করেন।
বিক্রেতা জানায়; দুটি পেইন্টিং দুহাজার টাকা মাত্র।
তখন ঐ ভদ্রলোক ঐ দুটি ছশো টাকায় নিতে চায়।
বিক্রেতা বলে, বউনির সময়, তাই দুটি পেইন্টিং আটশো টাকায় দিতে রাজি।
কিন্তু, ঐ ভদ্রলোক ছশো টাকার এক পয়সার ও বেশী দেবে না, এই বলে সে চলে যায়।
আমার চা আসে, চুমুক দিই।
একটি বই চোখে পড়ে, The Art of Natural History, S.Peter Dance - এর।
আমি সেটা মাত্র পাঁচ টাকায় কিনেছিলাম ঐ বিক্রেতার কাছ থেকে।
চা প্রায় শেষ; এই সময় আর এক ব্যক্তি আসেন এবং সে দুট পেইন্টিংয়ের দাম জানতে চায়।
বিক্রেতা বলে, দুটি পেইন্টিং দুহাজার টাকার এক পয়সার কম নয়।
ওই ব্যাক্তি দুহাজার টাকা বের করে দেয় ও আরো পঞ্চাশ টাকা বকশিস দিয়ে পেইন্টিং দুটি নিয়ে চলে যায়।
আমি ভাবছিলাম এমন মজাদার বাজার যেথায় হরেক রকমের পুরানো জিনিস পাওয়া যায়। কতো মানুষ আছে; যারা জিনিসপত্র পুরানো ও একঘেয়ে হয়ে গেলে দূরে সরিয়ে দেয়। আরো কতো মানুষ আছে; পুরানো দুষ্প্রাপ্য জিনিসপত্র খুঁজে বেড়ায় যত্ন করে রেখে দিতে চায়।
এমন সময়, প্রথম ভদ্রলোক ফিরে এসে সেই দুটি পেইন্টিং আটশো টাকায় কিনতে চাইলেন।
বিক্রেতা জানায় সে দু হাজার টাকায় পেন্টিং দুটি বিক্রি করে দিয়েছে ও আরো পঞ্চাশ টাকা বকশিস পেয়েছে।
এই কথা শুনে ঐ ভদ্রলোক মাথায় হাত দিয়ে ধপ্ করে বসে পড়ে আমার পাশেই।
মনে হল যেন ওনার শরীর খারাপ লাগছে।
এর পর উঠে বিক্রেতাকে রাগে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলে; "তুই এক মূর্খ, অশিক্ষিত; তাই মাত্র দুহাজার টাকায় বিক্রি করে দিয়েছিস, আবার পঞ্চাশ টাকা বকশিস পেয়ে খুশী হয়! জানিস কি? এখন ওই দুই পেইন্টিং বাজারে দশ লাখ টাকার ও বেশী দাম উঠতে পারে!"
বিক্রেতা নির্বিকার হয়ে বলে; আমি মূর্খ, জানি। তাই আমি এক হাজার দুশো পঞ্চাশ টাকা লাভ করতে পেরেছি।
আর আপনি বুদ্ধিমান ও শিক্ষিত মানুষ। তাই আপনি কি হাতছাড়া করেছেন, তা একটু ভেবে দেখুন!?
এই সমস্ত কিছুর সাক্ষী হয়ে চিন্তা করি; - এই বিচিত্র জগতে লাভ-ক্ষতি, চাওয়া-পাওয়া, দেওয়া-নেওয়ার হিসেব কে কেমন করে করে!
আমি সাইকেলে চেপে হোস্টেলের উদ্দেশ্যে রওনা হই।
শেষে জানিয়ে রাখি ঐ পেইন্টিং দুটি ছিল রাজা রবি বর্মার আঁকা শকুন্তলা ও আর একটা দময়ন্তী।