গল্প: এসএমএস
- পুলক সাঁপুই।
০৩-০১-২০২২
প্রচুর অর্কিডের ছবি কিছু দুজনার অন্তরঙ্গ মুহূর্তের পুরানো ছবি ও একটা বিশাল লম্বা এসএমএস পায় রীমা এক বিদেশী ফোন নাম্বার থেকে।
চমকে উঠে রীমা, হতভম্ব হয়ে পড়ে কিছুক্ষন, শেষে লেখা ইতি তোমার সিদ্ধার্থ।
চোখে ভেসে ওঠে সেই ছয় বছরের রিলেশনশিপ, যা উজ্জ্বল হয়ে আছে চির জীবনের মনের খাতায়। এর পরে ও কেটে গেছে আরো এক যুগ। আজ কেনো এই বিভীষিকা?? এমন তো কখনোই চাইনি রীমা। বারো বছর আগেই পাঠ চুকেছে সিদ্ধার্থের সাথে, সে বোটানিতে research রিসার্চ করতে স্কলারশিপ পেয়ে চলে যায় (Amsterdam) আমস্টারডাম, আর কোনো খবর ছিলনা তার। এর পরেই বাবা মায়ের ইচ্ছায় বাধ্য হয়েই বিয়ে করতে হয় রীমাকে। স্বামী ও নয় বছরে একটি মেয়ে এই সংসার জীবন। চাকরী সূত্রে আছে মুম্বাই। স্বামী, মাল্টি ন্যাশনাল কোম্পানীতে চাকরী, বিয়ের বছর না কাটতে কাটতে দুজন দুজনকে বুঝে নেয় মানসিক দিক থেকে দুজনেই আলাদা আলাদা, শারীরিক চাহিদার প্রয়োজনেই দুজনে একসাথে হয়।
তাই, সিদ্ধার্থের সাথে সেই ছয় বছর রীমা স্বর্ণোজ্জল স্মৃতিচারণে জীবনটা কাটিয়ে দিতে চায়। কিন্তু, আজকের এই ঘটনায় রীমা কিংক্তব্যবিমূঢ় হয়।
রীমা এসএমএস পড়ে সিদ্ধার্থের আসল উদ্দেশ্য খোঁজে; অনেক কষ্টেই এক রীমার ক্লাসের বান্ধবীর থেকে ফোন নাম্বার পেয়েছে সিদ্ধার্থ, কোনো এক সেমিনারে মুম্বাইয়ে কিছুদিনের জন্য আসছে সিদ্ধার্থ।
তাই দেখা করতে চায় সিদ্ধার্থ রীমার সাথে।
কিছু প্রজেক্ট করতে চায় রীমার সাথে ভারতে যুগ্ম ভাবে।
লেখার কিছু কিছু অংশ পড়ে রীমা শিহরিত হয়ে ওঠে-
"মনে পড়ে রীমা, আমাদের চিলেকোঠায় প্রথবারের মিলন বৈশাখের দুপুরের"
রীমার মনে পড়ে- সিদ্ধার্থের কাছে সম্পূর্ন অর্পন করে দিয়েছিল, মন ও শরীর। জীবনের প্রথম প্রেমের অন্তিম সুখানুভূতি।
সিদ্ধার্থ ছিলো ব্রিলিয়ান্ট স্টুডেন্ট, তার মনোমুগ্ধকর কথায় সম্মোহন হয়ে থাকতো রীমা। তার আদেশে আজ্ঞাবহ হয়ে চলতো রীমা।
রীমা এগারো ক্লাসে যখন, সিদ্ধার্থ এমএসসি শেষ করে পিএইচডি করতে সুরু করেছে। রীমা জানতো আরও একধিক মেয়েদের সাথে সিদ্ধার্থের শারীরিক সম্পর্ক আছে, তবুও রীমা সিদ্ধার্থের কাছে সম্পূর্নতা পেতে চেয়েছিল।
যাই হোক, জীবনে চলার পথে অনেক ঘটনা ঘটে, রীমা খুঁজে বেড়ায় এই সবের মানে:-
-স্বার্থ কি?
-পাপ, পূর্ণ কাকে বলে?
-সত্য কি? সততা কি?
-মানবিক মূল্যবোধ কি?
-জীবনের উদ্দেশ্য কি
__________________
-স্বার্থ কি?
প্রতিটা মানুষ এমন কেন স্বার্থপর হয়?
নিজেদের প্রয়োজনে অন্যকে ব্যবহার করে?
সিদ্ধার্থ সেই ছয় বছর তাকে নানা ভাবে ব্যবহার করেছে, আর এই বারো বছর পরে তাকে আবার মনে পড়েছে একই কারনে, স্বার্থ।
রীমা সিদ্ধার্থকে এই আরোপ করার পরে নিজেকে নিয়ে ভাবে:- রীমা ই প্রথম প্রপোজ করেছিলো সিদ্ধার্থকে, সিদ্ধার্থের ভালোলাগা গুলোকে স্বপ্নের আঙ্গিকে সাজিয়ে সিদ্ধার্থকে প্রেমে জড়িয়েছে সে নিজেই। দুজনেই আনন্দ নিয়েছে শারীরিক চাহিদার ও মনের চাহিদার।
আর যখন ছাড়াছাড়ি ও মনোমালিন্য হয়েছে, শুধু তাকে দোষ দিয়ে লাভ ক্ষতির বিচার করছে।
অপরের উপর দোষ আরোপ করে আত্ম সান্তনা পাওয়া ছাড়া আর কোনো ও লাভ নাই।
-পাপ, পূর্ণ কাকে বলে?
তবে কি সে পাপী? খুঁজতে থাকে এর উত্তর রীমা।
- ধর্মিয় রীতি নীতি ও জীবনধারা থেকে মানুষ এক অলীক কল্পনায় নিয়ম বানিয়েছে, সেখানে পাপ ও পূর্ণ-র নাম করে ঈশ্বর জাতীয় কাল্পনিক বস্তুকে সামনে রেখে ধর্মের স্বার্থে সমাজের আদিম প্রথা চলে আসছে এখনো।
যেমন;- হিন্দুদের কাছে গরুর মাংস খাওয়া পাপ, মুসলিমদের কাছে শুয়োর গোশত খাওয়া পাপ, মানবিক মূল্যবোধের দিক থেকে দেখলে গরু ও শুয়োর খেলে পাপ ও পূর্ণ কিছুই হয় না। পাপ ও পূর্ন বলে কিছু নেই।
হিন্দু মেয়েদের বিয়ের পর শাঁখা- সিঁদুর পরতে হয়, নইলে পাপ হয়, মুসলিম মেয়েদের চুল ঢেকে রাখতে হবে, নইলে পাপ হবে। মানবিক দৃষ্টিভঙ্গিতে এইগুলি মূল্যহীন।
এক দেশের মানুষ যাকে পাপ মনে করে, অন্য দেশের মানুষ তাকে পূর্ণ মনে করে। এখানে মানবিক মূল্যবোধ নিয়ে পথ চললে কি কিছু পাপ-পূর্ণর সজ্ঞা পাওয়া যায়? মানবিক দৃষ্টিভঙ্গির উন্নতমানের হলে, ও আত্মজ্ঞান থাকলে পাপ-পূর্ণ মিথ্যা হয়ে যায়।
রীমা নিজেই স্বীকার করে যে
সত্যি কথা বলতে কি সিদ্ধার্থের কাছে সে ঋণী এই কারণে যে, তার জন্যই বোটানি নিয়ে পড়াশোনা।
গ্র্যাজুয়েশন ও এমএসসি খুবই ভালো রেজাল্ট করতে পেরেছিল শুধুমাত্র তার জন্যই। তার অগাধ জ্ঞানে উদ্বুদ্ধ হয়ে নিজেকে ও শক্তিশালী করে গড়ে তুলতে পেরেছে। সে বিয়ের পরে পরেই ইন্টারন্যাশনাল স্কুলে চাকরী করে এবং নিজের কর্মদক্ষতায় পদোন্নতি পেতে থাকছিল; কিন্তু তাঁর স্বামীর কারণেই ছাড়তে বাধ্য হয় চার বছর পরে।
আরো এমন অনেক প্রগতিশীল কাজকর্ম করতে গিয়ে বারবার বাধাপ্রাপ্ত হতে হয়েছে রীমাকে স্বামীর কাছে। হায়! পাপ-পূর্ণ সত্যিই কুসংস্কার।
-সত্য কি? সততা কি? রীমা নিজেকে জিজ্ঞাসা করে এবং ভাবে সে নিজে কোন রাস্তায়?
নিজের জীবনের সমস্ত কর্মকাণ্ড যা নিজে স্বাক্ষী বহন করে এগিয়ে চলেছে তাহাই সত্য। নিজের সত্য প্রয়োজনে কোথাও প্রকাশ পায়, আবার কোনো সত্য আজীবন কোথাও প্রকাশ করা যায় না। সত্য প্রকাশ করে অন্যের কাছে সততা দেখানোর কোনোও প্রয়োজন নেই। যা সত্য তাহার ন্যায্যতা প্রতিপাদন করা আবশ্যক নয় কখনোই অন্যের কাছে।
তবে, সততা কি?
মানবিক মূল্যবোধ নিয়ে পথ চলাই সততা।
দেহকে সমজের নিয়মের মধ্যেই পরিচালিত করতে বাধ্য। দেহ নিজের হয়ে ও নিজের নয় অনেক অংশেই।
কিন্তু মন সম্পূর্ন নিজেরই থাকে, সেই মনের স্বাধীনতাতেই সে উৎজিবিত করে প্রেমের মাঝে এগিয়ে চলতে চায় সারাজীবন।
এই সত্য তার কাছে একান্ত আপন। জীবন কাটাতে চায় সততা বা মূল্যবোধের মাঝে।
-মানবিক মূল্যবোধ কি?
কর্তব্যবোধ বা শ্রদ্ধাশীলতার সাথে কাজ সম্পূর্ন করা মানবিকতা।
ব্যাক্তি জীবনে একে অপরের হস্তক্ষেপ করা উচিত নয়। - এটা ও মানবিকতার মধ্যেই পড়ে, সেখানে স্বামী বা স্ত্রী বা সন্তান বা প্রেমী যে কেউই হোক না কেন।
ব্যক্তি জীবন সম্পূর্ন আপন পথে চলে, কেউ কারোর গোলাম নেই সেথায়।
-জীবনের উদ্দেশ্য কি?
রীমা নিজেকে জানতে চায়। অপরকে দোষ না দিয়ে, কর্তব্যের মাঝে নিজেকে সংগঠিত করে সৃজনশীল কাজে এগিয়ে যাওয়া জীবন, জীবনের উন্নতির পথে যে সাথে থাকবে সেই প্রেম। সেই আপনজন।
মনের ডাকে সাড়া দিয়ে প্রেমের পথেই আগামী দিনগুলো কাজে লাগাতে চায় রীমা, উদ্ভাবনী শক্তি নিয়ে আবার যোগ দিতে চায় সিদ্ধার্থের সাথে নতুন বোটানি প্রজেক্টে।
জীবনের গতিপথ প্রাকৃতিক নিয়মে এগিয়ে চলা প্রেমের মাঝে, ইহার নাম ই জিন্দেগী।